রাজধানীর উত্তরখানে তুরাগ নদ থেকে বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরির (২৮) মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁর মৃত্যু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে। এর মধ্যে তাহসিফের সহপাঠী কেএসএম ইনতিসার ইনজিমামের একটি ফেসবুক পোস্ট নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পোস্টে তিনি দাবি করেছেন, মৃত্যুর পেছনে ব্যক্তিগত বিরোধ বা দুর্ঘটনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হলে তিনি ঘটনাটিকে রাজনৈতিক বলে মনে করবেন।
তবে তাহসিফের মৃত্যুর সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে রাজধানীর উত্তরখান থানার রাজাবাড়ী ঘাটসংলগ্ন তুরাগ নদ থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ-পুলিশ।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দিবাগত রাত ২টা ২৯ মিনিটে দেওয়া পোস্টে ইনতিসার ইনজিমাম তাহসিফকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বন্ধুর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন তিনি।
পোস্টে ইনজিমাম লেখেন, ‘গত পরশু রাতে সে বাইরে যায় এরপর এই ঘটনা। তার লাশের ছবিতে হাতে কাদা মাখা। বাকি সব ক্লিন, এইটা কিসের লক্ষণ আমি এখনি বলতে চাইনা তবে এইটা ব্যক্তিগত কোন কোন্দল বা এক্সিডেন্ট ক্লিয়ারলি প্রমাণিত না হলে। আমি ধরে নিব এইটা পলিটিকাল।’
তাঁর এই বক্তব্যে তাহসিফের মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও পোস্টে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি আপাতত তাঁর ব্যক্তিগত ধারণা হিসেবেই বিবেচ্য।
ইনতিসার ইনজিমাম জানান, আদমজী কলেজে তাহসিফের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। পরে তাঁরা বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে ৭৯ বিএমএ ইক্যুইভ্যালেন্ট কোর্সে সহপাঠী ছিলেন।
বন্ধুর সঙ্গে আদর্শগত পার্থক্যের কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, দুজনের জীবনদর্শন এক ছিল না। তবে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে কথা বললে তাহসিফ মনোযোগ দিয়ে শুনতেন বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন।
ইনজিমাম আরও দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তাহসিফকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়েছিল। তাঁর জানা মতে, এ ঘটনায় তাহসিফের বিরুদ্ধে কোনো পুলিশি মামলা হয়নি। পোস্টের শেষ দিকে বন্ধুর জন্য দোয়া করেন তিনি।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তাহসিফ মাঝেমধ্যে তুরাগ নদীর রাজাবাড়ী ঘাট এলাকায় যেতেন। ঘটনার দিনও তিনি উত্তরা এলাকার বাসা থেকে বের হয়ে সেখানে গিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
পরিবারের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ওই দিন তাহসিফ এক জুনিয়র বন্ধুর সঙ্গে বাইরে বের হয়েছিলেন। এরপর তিনি আর বাসায় ফেরেননি। পরিবারের সদস্যরা তাঁর খোঁজাখুঁজি শুরু করার পর নদীর ঘাটসংলগ্ন এলাকা থেকে মরদেহ উদ্ধারের খবর পান।
তদন্তের অংশ হিসেবে তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ বাইরে যাওয়া ব্যক্তির বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঘটনার দিন তাঁরা কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং এরপর কী ঘটেছিল—এসব বিষয় খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
তাহসিফের মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর ফরেনসিক দল যায়। তারা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্তে যুক্ত হয়েছে।
মরদেহের অবস্থান এবং শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন না থাকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। বিষক্রিয়া, শ্বাসরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণে মৃত্যু হয়েছে কি না, তা-ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
ঢাকা অঞ্চল নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কিছু নেই, যেটি দেখে মৃত্যুর কারণ বলা যায়। বিষক্রিয়া, শ্বাসরোধসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাও তদন্তে বিবেচনায় থাকতে পারে। তবে ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার আগে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।’
তিনি জানান, নৌ-পুলিশের পাশাপাশি একাধিক সংস্থা নিজ নিজ উদ্যোগে তথ্য সংগ্রহ করছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে তখনো কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পরিবারের অভিযোগের পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. রেজাউল করিম জানান, তাহসিফের বাবা তখনো কোনো অভিযোগ দায়ের করেননি। পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যার অভিযোগ না এলে অস্বাভাবিক মৃত্যুর (ইউডি) মামলা করা হবে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে ঘটনাটি নৌ-পুলিশ তদন্ত করছে। পাশাপাশি পুলিশের অন্যান্য ইউনিটও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।